যে নাম্বার থেকে কল আসলে রিসিভ করলেই বিকাশের টাকা উধাও হয়ে যায়!

0

নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে বিকাশ থেকে টাকা উধাও হওয়ার ঘটনা। বিত্তশালী থেকে শুরু করে গরীব দীন মজুরেরাও ছাড় পাচ্ছে না প্রতারক চক্রের  হাত থেকে। অথচ, এবিষয়ে উদাসীন সংশ্লিষ্ট কোম্পানী এবং মোবাইল ব্যাকিং কর্তৃপক্ষ।

ভূক্তোভোগিরা জানান, অভিযোগ দিয়েও কোনো লাভ হয় না কাস্টমার কেয়ারে গুলোতে। তাই ক্ষোভে গালাগালি দিয়ে নিজের মনকে শান্তনা দেওয়া ছাড়া কোনো উপায়ও নেই।

অনেকে অভিযোগ করে বলেন, হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেনকারী ডিজিটাল মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর ত্রূটির কারণে উধাও হচ্ছে মোবাইল একাউন্টে থাকা অর্থ।

রাজশাহী বিকাশ অফিস এবং কয়েকটি বিকাশ এজেন্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রায় কয়েকদিন পর পরই প্রতারক চক্রের ফাদে পা দিয়ে টাকা হারানোর কথা অনেকের কাছেই শুনতে পায় আমরা। ইদানিং বিকাশ এ্যাপ থেকে টাকা গায়েবের ঘটনা প্রায়-ই শুনতে পাচ্ছি। লোভনীয় অফার, বৃত্তির টাকা, ট্রানজেশনে ফি কম কাটবে, লটারি পাওয়া, বিকাশের সমস্যা দেখিয়ে পিন চাওয়া, সরকারী গোয়েন্দা সংস্থা থেকে পিন বা টোকেন  গেছে ইত্যাদি বলে বিকাশ পিন হাতিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়। যারা ফাঁদে পড়ে, খোয়া যায় তাদের অর্থ।

রাজশাহী মহানগরীর একজন বিকাশ এজেন্ট জানান, মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানিগুলোর দূর্বলতার কারণে হর হামেশাই এমন টাকা উধাও ঘটনা শোনা যাচ্ছে। এছাড়া ব্যস্ত সময়ে চোরেরা ফেক ম্যাসেজ দিয়ে এজেন্টদের কাছে টাকা চেয়ে বসে। ধরা পড়লে পিছন থেকে আরেকজন টাকা পাঠিয়ে দেয় সঙ্গে সঙ্গে। এমন ঘটনা আমার সাথে এবং রাজশাহী সাহেব বাজারের বেশ কয়েকটি এজেন্টদের সাথে ঘটেছে। বিকাশের এমন দূর্বল সিস্টেমের কারণে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। সামান্য লাভে অধিক অর্থ লেনদেনে ধরা খাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী বিকাশের ব্যবসা বন্ধও করে দিয়েছে।

টাকা উধাও হওয়া এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে রাজশাহী স্টেশন সংলগ্ন গরীব চা ওয়ালা মনিরের সাথে। মনিরের মোবাইল থেকে হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে বিকাশের টাকা। মৃত বাবার চল্লিশার জন্য ঢাকা থেকে টাকা পাঠিয়েছিলেন তার দুলা ভাই। তিনি জানান, মাত্র ২ ঘন্টার ব্যবধানে ৭,৫১৬ টাকা উধাও হয়ে যায় একাউন্ট থেকে। কিভাবে, কি হলো আমি কিছুই বুঝলাম না?

অভিযোগকারী মুনির আরো জানান, টাকা পাওয়ার পর বিকাশ একাউন্ট নিয়ে কোনো প্রকার ঘাটা-ঘাটি করিনি অথবা একাউন্ট হ্যাক হয় এমন কোনো কাজ করা হয়নি। এমনকি প্রতারক চক্র থেকে কোনো কল আসেনি বিকাশ একাউন্ট হ্যাক হওয়ার মতো। তারপরও টাকা মোবাই থেকে গায়েব হয় কি করে?

তিনি আরোও জানান, বিকাশ একাউন্ট খোলা ফোন টা আমার বোন ব্যবহার করে। গত ৭ তারিখ সন্ধ্যা ৭ টার সময় আমার দুলা ভাই টাকা পাঠাই ১,৫০০ এবং ৬,০০০ টাকা মোট ৭,৫০০ টাকা। টাকা একাউন্টে আসা দেখে আমরা ঘুমিয়ে যায়। পরের দিন টাকা তুলতে এলাকার পরিচিত দোকানে যায়। কিন্তু বিকাশ দোকানদার বলে একাউন্টে টাকা নাই। মাত্র ১.২৫ পয়সা আছে।

দোকানদার আমাদের পরিচিত, সে আমাদের বিকাশ কাস্টমার কেয়ারে যেতে বলে। তার পরামর্শে কাস্টমার কেয়ারে যাই। কিন্তু কাস্টমার কেয়ারে আমি ও আমার বোন অভিযোগ নিয়ে যেয়ে কোনো লাভ হয়নি। তারা আমাদের সহযোগিতা না করে বলে- আমাদের বোকামির কারণে কেউ বিকাশ এ্যাপ থেকে টাকাগুলো বের করে নিয়েছে। অথচ, আমার পরিবারে কেউ বিকাশ এ্যাপ ব্যবহার করে না। এমনকি পিনও কেউ জানে না। তারপরও টাকা কিভাবে হাওয়া হয়ে গেলো বুঝলাম না।

মনির জানান, আামর এলাকার একটা বন্ধুকে নিয়ে যাওয়ার পর তারা আমাকে স্টেটমেন্ট প্রদান করে। যেখানে দেখা যায়, ৭ তারিখ রাত ৯ টা ১ মিনিটে সেন্ড মানি করে বিকাশ এ্যাপের মাধ্যমে  ০১৭৮২-০৪৯০৫৭ নাম্বার থেকে ০১৪০০-৪২৫৩২৪ নাম্বারে ৭,৫১৬ টাকা ট্রান্সফার করা হয়েছে। যার ট্রানজেকশন আই.ডি হচ্ছে- 6D732NAPRI।

এবিষয়ে সময়ের আলো প্রতিনিধিকে বিকাশ ইনচার্জ আমিরুল ইসলাম বলেন, চুরির বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে জানতে পারলে টাকাটা আমরা চোরের একাউন্ট আটকে ফিরিয়ে আনতে পারতাম। কিন্তু চুরি যাওয়া টাকা চোরের একাউন্টে নেই। তাই আমাদের করার কিছু নেই।

এ্যাপ থেকে টাকা উধাও ও এর প্রতিকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এ্যাপ থেকে টাকা উঠানোর সময় পূর্বে ওটিপি বা একটি ম্যাসেজ যাওয়ার ব্যবস্থা ছিলো। কিন্তু বর্তমানে সেটি নেই। যার কারণে চোরেরা বিভিন্ন মাধ্যমে পিন হাতিয়ে নিয়ে সহজে টাকা হাতিয়ে নিতে সক্ষম হচ্ছে। যদিও আমাদের পক্ষ থেকে কাস্টমারদের ব্যাপক ভাবে সচেতনতা তৈরি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে টিভি, অনলাইন, নিউজ পেপার, রেডিও প্রভৃতি গণমাধ্যমে প্রচারণা করা হচ্ছে। এমনকি গ্রামে গঞ্জে মাইকিং পর্যন্ত করানো হয়েছে সচেতনতা সৃষ্টিতে।

অনেকটা দায় এড়ানোর মতোই চলছে রাজশাহী বিকাশ কাস্টমার কেয়ার। অসহায় সহজ সরল লোকগুলো সমস্যা নিয়ে বিকাশ কাস্টমার কেয়ারের সরণাপন্ন হলে সহজে মিলছে না সেবা। আবার অনেক সময় ব্যবহারও ভালো করছে না কাস্টমার সেবা প্রদানকারীরা। কিন্তু কোনো বড় মাপের লোকজন আসলে তাদের কাজ হয়ে যাচ্ছে মুহূর্তের মধ্যেই। এমনই অভিযোগ করেন ভাটাপাড়া নিবাসী রুনু নামের একজন ব্যবসায়ীসহ উপস্থিত আরো অনেকেই।

আইটি বিষেজ্ঞদের মতে, অনলাইন ব্যাংক একাউন্ট বা মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্টে থেকে টাকা ট্রান্সফার করলে একটা ওটিপি বা ফিরতি ভ্যারিফিকেশন কোড যায় একাউন্ট যে নাম্বারে খোলা আছে। কিন্তু বর্তমানে বিকাশের এ্যাপ ব্যবহারে সেই সিকিউরিটি টা নাকি নেই।

অর্থাৎ, কারো বিকাশ পিন যদি কোনো ব্যক্তি (চোর) জেনে নেয় তাহলে বিকাশ এ্যাপ থেকে গোপনে টাকা তুলে নিলে কেউ টের পাবে না। অথচ, বিকাশের এই বাজে সিস্টেমের কারণে প্রতিনিয়তই কেউ না কেউ প্রতারিত হচ্ছে কোনো না কোনো প্রতারক দ্বারা। অথচ, বিকাশ বা পুলিশ প্রসাশনের এই বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেই।

উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশে এমন ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানি থেকে পুলিশের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে মোবাইল ট্রাক করে বা আইপি এ্যাড্রেস ডিটেকশনের মাধ্যমে চোর ধরার চেস্টা করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এমন টা করা হয় না। কোম্পানির ও পুলিশ প্রশাসন উভয়ই গা ছাড়া ভাব দেখাই। যার কারণে ছাড় পেয়ে আরো উৎসাহিত হচ্ছে হ্যাকার বা ডিজিটাল চোরেরা। আর এসব সমস্যায় প্রতিনিয়তই পড়তে হচ্ছে জনসাধারণদের।

মোবাইল ব্যাংকিং ও হ্যাকিং এর বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসসি বিভাগের অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার বলেন, বর্তমানে প্রায় মোবাইল হ্যাকিং এর মাধ্যমে টাকা চুরির বিষয়টি শোনা যাচ্ছে। টাকা উঠানোর সময় যদি কোনো ওটিপি বা ভারিফিকেশন কোড ব্যবহার করা যায় তাহলে এমন অনাকাঙ্খিত ঘটনা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। যেখানে লক্ষ কোটি টাকার ব্যবসা সেখানে এসব বিষয়গুলো থাকা অতি জরুরী। তা নাহলে এমন ঘটনা প্রায়শই ঘটবে, যা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও ব্যবসা উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here